কেন আফ্রিকা থেকে পিঁপড়া পাচারে ঝুঁকছে চোরাকারবারিরা

প্রকাশঃ এপ্রিল ২১, ২০২৬ সময়ঃ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ

কেনিয়ার একটি আদালত গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) এক চীনা নাগরিককে ১০ লাখ কেনিয়ান শিলিং (প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ মার্কিন ডলার) জরিমানা করেছে। একই সঙ্গে তাকে ১২ মাসের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ ছিল, তিনি কেনিয়া থেকে জীবন্ত পিঁপড়া বিদেশে পাচারের চেষ্টা করেছিলেন। দেশটির আইন অনুযায়ী, বন্য প্রাণী কিংবা পোকামাকড় অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে নেওয়া গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

আদালত রায়ে উল্লেখ করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পিঁপড়া পাচারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে কঠোর শাস্তি জরুরি বলেও তারা মন্তব্য করে। গত মাসে নাইরোবির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঝাং কেকুন নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তার লাগেজ তল্লাশি করে প্রায় ২ হাজার ২০০টির বেশি জীবন্ত পিঁপড়া উদ্ধার করা হয়। এসব পিঁপড়ার প্রধান বাজার চীন, যেখানে শখের বশে অনেকে পিঁপড়ার কলোনি তৈরি করে পালন করেন। এই শখের ব্যবস্থাকে বলা হয় “ফর্মিকারিয়াম”।

সহজভাবে বলতে গেলে, ফর্মিকারিয়াম হলো পিঁপড়া পালনের জন্য তৈরি বিশেষ কাচের আবাস। যেমন অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছ রাখা হয়, তেমনি এই স্বচ্ছ পাত্রে পিঁপড়াদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। অনেকেই একে “অ্যান্ট ফার্ম” নামেও চেনেন। এর ভেতরে পিঁপড়াদের চলাফেরা, সুড়ঙ্গ তৈরি, খাবার সংগ্রহ কিংবা রানী পিঁপড়ার কার্যক্রম খুব সহজেই বাইরে থেকে দেখা যায়। মূলত এই অনন্য সামাজিক আচরণ কাছ থেকে দেখার আগ্রহ থেকেই অনেক মানুষ পিঁপড়া পালনে আগ্রহী হন এবং এর জন্য অর্থ ব্যয় করতেও পিছপা হন না।

কেনিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা কেডব্লিউএস (KWS) সাধারণত হাতি বা গন্ডারের মতো বড় প্রাণী রক্ষায় কাজ করে থাকে। তবে চলতি মাসের শুরুতে তারা এক ভিন্ন ধরনের অভিযানে নামে। পশ্চিম কেনিয়ার একটি গেস্টহাউসে অভিযান চালিয়ে তারা এমন কিছু পাচার হওয়া প্রাণী উদ্ধার করে, যেগুলোর আকার মানুষের নখের চেয়েও ছোট।

সেখানে প্রায় ৫ হাজারের বেশি জীবন্ত পিঁপড়া পাওয়া যায়। এগুলো ছোট ছোট টেস্টটিউব ও সিরিঞ্জের ভেতরে তুলা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বেলজিয়ামের ১৯ বছর বয়সী দুই তরুণ—লর্নয় ডেভিড ও সেপ্পে লোডেভিকক্স। তাদের পরিকল্পনা ছিল এই পিঁপড়াগুলো ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে পোষা প্রাণী হিসেবে উচ্চ দামে বিক্রি করা। তবে গ্রেপ্তারের পর তারা দাবি করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে আইন ভাঙার উদ্দেশ্য ছিল না, বরং অজ্ঞতাবশত এই কাজ করেছেন।

সম্প্রতি কেনিয়ায় এ ধরনের ক্ষুদ্র প্রাণী পাচারের প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে কেডব্লিউএস। পাচারকারীরা এখন বড় প্রাণীর পরিবর্তে ছোট কিন্তু পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে পিঁপড়া পালনের শখ জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এদের চাহিদাও বেড়েছে।

উদ্ধার হওয়া পিঁপড়াগুলোর মধ্যে “মেসর সেফালোটেস” প্রজাতি ছিল, যা জায়েন্ট আফ্রিকান হারভেস্টার অ্যান্ট নামে পরিচিত। সংগ্রাহকদের কাছে এই প্রজাতি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। একটি পূর্ণাঙ্গ কলোনির দাম প্রায় ৯৯ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টাকার সমান।

অনেকের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে কাচের ভেতরে পিঁপড়াদের শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন পর্যবেক্ষণ করা মানসিক প্রশান্তি দেয়। তবে বিজ্ঞানীরা এ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কোনো প্রজাতিকে তার স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে গেলে তা নতুন পরিবেশে আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

কেনিয়ার খ্যাতনামা গবেষক ডিনো মার্টিনস জানান, জায়েন্ট আফ্রিকান হারভেস্টার অ্যান্ট সাভানা অঞ্চলের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা ঘাসের বীজ সংগ্রহ করে মাটির নিচে জমা রাখে, যার ফলে অনেক বীজ ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন উদ্ভিদের জন্ম হয়। এতে তৃণভূমি সবুজ ও সক্রিয় থাকে। পাশাপাশি প্যাঙ্গোলিন ও আর্ডভার্কের মতো প্রাণীর প্রধান খাদ্যও এই পিঁপড়া। ফলে এদের পাচার শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে না, বরং খাদ্যশৃঙ্খলেও বিরূপ প্রভাব ফেলে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য



আর্কাইভ

April 2026
SSMTWTF
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
20G